ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ভৗগোলিক অবস্থানঃ নোয়াখালী জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা আগে ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত।

নোয়াখালী জেলার মোট আয়তন ৪২০২ বর্গ কিলোমিটার। নোয়াখালী জেলার উত্তরে কুমিল্লা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে লক্ষীপুর ও ভোলা জেলা অবস্থিত। এই জেলার প্রধান নদী মেঘনা । এছাড়াও উল্লেখযোগ্য নদ-নদীর মাঝে ছোট ফেনী, ডাকাতিয়া অন্যতম। ডাকাতিয়া ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হতে কুমিল্লার বাগছাড়া দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য ২০৭ কি.মি. যার মধ্যে ১৮০ কিমি কুমিল্লায় ও ২৭ কিমি নোয়াখালীতে প্রবাহিত হয়েছে। ছোট ফেনী নদী ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়ী অঞ্চল হতে কুমিল্লার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গুনবতি নামক স্থান দিয়ে নোয়াখালীতে প্রবেশ করেছে।এছাড়াও নোয়াখালীতে বহু খাল রয়েছে যার মধ্যে নোয়াখালী খাল, মধুখালি খাল, রহমতখালি খাল, আতিয়াবাড়ি খাল, কালির খাল, পেটকাটা খাল, কথাকলি খাল, গোয়ালখালি খাল, আত্রা খাল, হুরা খাল, গাহজাতলি খাল, ভবানিগঞ্জ খাল, মহেন্দ্রক খাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

দেশে জেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় থেকেই। ১৭৭২ সালে কোম্পানীর গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এদেশে প্রথম আধুনিক জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা নেন। তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে ১৯টি জেলায় বিভক্ত করে প্রতি জেলায় একজন করে কালেক্টর নিয়োগ করেন। এ ১৯টি জেলার একটি ছিল কলিন্দা। এ জেলাটি গঠিত হয়েছিল মূলতঃ নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে। কিন্ত ১৭৭৩ সালে জেলা প্রথা প্রত্যাহার করা হয় এবং প্রদেশ প্রথা প্রবর্তন করে জেলাগুলোকে করা হয় প্রদেশের অধীনস্থ অফিস। ১৭৮৭ সালে পুনরায় জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং এবার সমগ্র বাংলাদেশকে ১৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। এ ১৪ টির মধ্যেও ভুলুয়া নামে নোয়াখালী অঞ্চলে একটি জেলা ছিল। পরে ১৭৯২ সালে ত্রিপুরা নামে একটি নতুন জেলা সৃষ্টি করে ভুলুয়াকে এর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তৎকালে শাহবাজপুর, হাতিয়া, নোয়াখালীর মূল ভূখন্ড, লক্ষ্মীপুর ,ফেনী , ত্রিপুরার কিছু অংশ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও মীরসরাই নিয়ে ছিল ভুলুয়া পরগনা। ১৮২১ সালে ভুলুয়া নামে স্বতন্ত্র জেলা প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চল ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলাকে নোয়াখালী জেলা নামকরণ করা হয়।

১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নোয়াখালীর মাটি রঞ্জিত হয়ে আছে। ১৫ই জুন, ১৯৭১ সালে সোনাপুর আহমদীয়া স্কুলের সম্মুখ যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। ১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট পাকবাহিনী বেগমগঞ্জ থানার গোপালপুরে গণহত্যা চালায়। নিহত হন প্রায় ৫০ জন নিরস্ত্র মানুষ। নোয়াখালী জেলা স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর।

নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী মহকুমা নিয়ে নোয়াখালী জেলা চট্টগ্রাম বিভাগের অর্ন্তভূক্ত একটি বিশাল জেলা হিসেবে পরিচালনা হয়ে আসছিল। ১৯৮৪ সালে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকল মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হলে লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলা আলাদা হয়ে যায়। শুধুমাত্র নোয়াখালী মহকুমা নিয়ে নোয়াখালী জেলা পুনর্গঠিত হয়।

ইতিহাসঃ নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে একবার ত্রিপুরা-র পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়া-র উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসাবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়, যা পানির প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় "নোয়া (নতুন) খাল" বলা হত, এর ফলে অঞ্চলটি একসময়ে লোকের মুখেমুখে পরিবর্তিত হয়ে "নোয়াখালী" হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। নোয়াখালী জেলার মর্যাদা পায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক

প্রশাসনিক এলাকাসমূহঃ নোয়াখালী জেলায় ৯টি উপজেলা, ৮ টি পৌরসভা, ৭২ টি ওয়ার্ড, ১৫৩ টি মহল্লা, ৯১ টি ইউনিয়ন, ৮৮২ টি মৌজা এবং ৯৬৭ টি গ্রাম রয়েছে।উপজেলাঃ নোয়াখালী জেলার ৯টি উপজেলা হচ্ছে : নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, সেনবাগ, সুবর্ণ চর, সোনাইমুড়ি ও কবিরহাট উপজেলা । আর জেলায় রয়েছে ৮ টি পৌরসভা এগুলো হলো: নোয়াখালী পৌরসভা, চৌমুহানী, চাটখিল, বসুরহাট, হাতিয়া, সেনবাগ, সোনাইমুড়ি ও কবিরহাট পৌরসভা।

জনসংখ্যাঃ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নোয়াখালী জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,০৮,০৮৩ (পুরুষ- ১৪,৮৫,১৬৯ এবং মহিলা- ১৬,২২,৯১৪)। পুরুষ এবং মহিলার অনুপাত ৯২ঃ১০০, জনসংখ্যার ঘনত্ব ৮৪৩/ বর্গ কিলোমিটার এবং জন্মহার ১.৮৩%। জেলার শিক্ষার হার ৫১.৩%। শহরের শিক্ষার হার ৬০.৭%।

ধর্মঃ জেলার মোট জনসংখ্যার ৯৫.৪২% ইসলাম, ৪.৫২% হিন্দু, ০.০২% খ্রীস্টান, ০.০৩% বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। নোয়াখালী জেলায় ৪১৫৯ টি মসজিদ, ৪৯৭ টি ঈদগাহ, ২৩৯ টি মন্দির, ২ টি প্যাগোডা এবং ১ টি ক্যাথলিক খ্রিস্টান গীর্জা রয়েছে।

নোয়াখালীর শহরঃ নোয়াখালী সদর মাইজদী ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। শহরের মোট জনসংখ্যা ৭৪,৫৮৫ জন। নোয়াখালী সদরের আদি নাম সুধারাম। ১৯৪৮ সালে যখন থানা সদর দফতর মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তখন তা ৮ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে বর্তমান মাইজদীতে স্থানান্তর করে হয়।চৌমুহনী নোয়াখালীর আরেকটি ব্যস্ত শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র, যা একসময়ে মুদ্রণ, পাট ও প্রকাশনা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। বর্তমান বসুরহাট শহরটি দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং ব্যস্ত শহরের রুপ নিচ্ছে ।

অর্থনীতিঃ নোয়াখালী জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। আঞ্চলিক জিডিপির প্রায় ৪০ % কৃষি খাত থেকে আসে এবং জেলার ৮০ ভাগ লোক এই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট। নিন্মভূমি অঞ্চল হওয়াতে এই জেলায় প্রচুর মৎস্য চাষ হয়ে থাকে যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। ফসল উৎপাদন মূলত বছরে একবারই হয়।নোয়াখালী জেলায় শিল্প কারখানা তেমনভাবে গড়ে উঠেনি তবে বর্তমানে বেগমগঞ্জ ও নোয়াখালী সদর উপজেলায় ভারী শিল্প কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু হয়েছে।

নোয়াখালীর প্রশাসনিক এলাকাসমূহঃ নোয়াখালী জেলায় ৯টি উপজেলা, ৮ টি পৌরসভা, ৭২ টি ওয়ার্ড, ১৫৩ টি মহল্লা, ৯১ টি ইউনিয়ন, ৮৮২ টি মৌজা এবং ৯৬৭ টি গ্রাম রয়েছে।উপজেলাঃ নোয়াখালী জেলার ৯টি উপজেলা হচ্ছে : নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, সেনবাগ, সুবর্ণ চর, সোনাইমুড়ি ও কবিরহাট উপজেলা । আর জেলায় রয়েছে ৮ টি পৌরসভা এগুলো হলো: নোয়াখালী পৌরসভা, চৌমুহানী, চাটখিল, বসুরহাট, হাতিয়া, সেনবাগ, সোনাইমুড়ি ও কবিরহাট পৌরসভা।

জনসংখ্যাঃ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নোয়াখালী জেলার মোট জনসংখ্যা ৩১,০৮,০৮৩ (পুরুষ- ১৪,৮৫,১৬৯ এবং মহিলা- ১৬,২২,৯১৪)। পুরুষ এবং মহিলার অনুপাত ৯২ঃ১০০, জনসংখ্যার ঘনত্ব ৮৪৩/ বর্গ কিলোমিটার এবং জন্মহার ১.৮৩%। জেলার শিক্ষার হার ৫১.৩%। শহরের শিক্ষার হার ৬০.৭%।

ধর্মঃ জেলার মোট জনসংখ্যার ৯৫.৪২% ইসলাম, ৪.৫২% হিন্দু, ০.০২% খ্রীস্টান, ০.০৩% বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। নোয়াখালী জেলায় ৪১৫৯ টি মসজিদ, ৪৯৭ টি ঈদগাহ, ২৩৯ টি মন্দির, ২ টি প্যাগোডা এবং ১ টি ক্যাথলিক খ্রিস্টান গীর্জা রয়েছে।

নোয়াখালীর শহরঃ নোয়াখালী সদর মাইজদী ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। শহরের মোট জনসংখ্যা ৭৪,৫৮৫ জন। নোয়াখালী সদরের আদি নাম সুধারাম। ১৯৪৮ সালে যখন থানা সদর দফতর মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তখন তা ৮ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে বর্তমান মাইজদীতে স্থানান্তর করে হয়।চৌমুহনী নোয়াখালীর আরেকটি ব্যস্ত শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র, যা একসময়ে মুদ্রণ, পাট ও প্রকাশনা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। বর্তমান বসুরহাট শহরটি দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং ব্যস্ত শহরের রুপ নিচ্ছে ।অর্থনীতিঃ নোয়াখালী জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। আঞ্চলিক জিডিপির প্রায় ৪০ % কৃষি খাত থেকে আসে এবং জেলার ৮০ ভাগ লোক এই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট। নিন্মভূমি অঞ্চল হওয়াতে এই জেলায় প্রচুর মৎস্য চাষ হয়ে থাকে যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। ফসল উৎপাদন মূলত বছরে একবারই হয়।নোয়াখালী জেলায় শিল্প কারখানা তেমনভাবে গড়ে উঠেনি তবে বর্তমানে বেগমগঞ্জ ও নোয়াখালী সদর উপজেলায় ভারী শিল্প কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু হয়েছে। নোয়াখালীর মানুষ মূলত কাজের জন্য দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে গমন করেন। জেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স পাঠানো জেলাগুলোর মধ্যে নোয়াখালী জেলা গুরূত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।

শিক্ষাঃ নোয়াখালীর শিক্ষার হার ৫১.৩০%। নোয়াখালীতে ০১ টি বিশ্ববিদ্যালয় , ১ টি সরকারী মেডিক্যাল কলেজ, ১টি টেক্সটটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ১২৪৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৮৯ টি ( ১২টি সরকারী ও ২৭৭টি বেসরকারী ) মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৫ টি কলেজ ( ০৮টি সরকারী ও বেসরকারী ২৭টি), ১৬১ টি ( ৩০টি দাখিল ও আলিম ১৩১টি) মাদ্রাসা, ০১টি কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ০১টি পিটিআই রয়েছে।

যাতায়াত ব্যবস্থাঃ সড়ক, রেল ও নৌ পথে নোয়াখালী জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। নোয়াখালী থেকে সড়ক পথে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দূরত্ব যথাক্রমে ১৫১ ও ১৩৪ কি মি। বাসই মূলত দূর যাতায়াতের প্রধানতম মাধ্যম।

পর্যটন স্থানঃ নিঝুম দ্বীপ, শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম, বজরা শাহী মসজিদ, লুর্দের রাণীর গীর্জা, গান্ধী আশ্রম, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, চর জব্বর, নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ, মাইজদী, নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মাইজদী, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, সোনাইমুড়ী, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের আশ্রম, চৌমুহনী উল্লেখযোগ্য।

উপজেলা পরিচিতিঃ
সুধারাম (সদর) উপজেলাঃ আয়তন এবং জনসংখ্যার দিক থেকে সদর থানাটি নোয়াখালী জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম থানা হিসেবে পরিচিত। ১৮৬১ সালে এটি একটি থানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ থানাটির পূর্বে ‘সুধারাম’ থানা হিসেবে পরিচিতি ছিল। ‘সুধারাম মজুমদার’ নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী ও জনহিতৈষি ব্যক্তির নামানুসারে এ থানার নাম সুধারাম থানা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে বলে জানা যায়। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এ থানা নোয়াখালী সদর থানা হিসেবে পুন:নামকরণ করা হয়। আন্ডার চর, অশ্বদিয়া, বিনোদপুর,চর মটুয়া, দাদপুর, ধর্মপুর , এওজবালিয়া , কাদির হানিফ , কালাদরফ, নিয়াজপুর , নোয়াখালী , নোয়ান্নাই , পূর্ব চর মটুয়া ইউনিয়ন নিয়ে সদর উপজেলা গঠিত। এ উপজেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হচ্ছে ঃ শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম, লুর্দের রাণীর গীর্জা, নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ, নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরী, নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ উল্লেখযোগ্য।

বেগমগঞ্জ উপজেলাঃ
বেগমগঞ্জ উপজেলা নোয়াখালীর একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এককালে বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ এ উপজেলায় বা থানায় দুটি সংসদীয় আসন ছিলো। ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার বিচারে এ অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ উপজেলার চৌমুহনী দেশের অন্যতম বিখ্যাত বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ। বর্তমানে বেগমগঞ্জ উপজেলা ১৬ টি ইউনিয়ন ও ১টি চৌমুহনী পৌরসভা নিয়ে গঠিত। বর্তমানে আলাইয়ারপুর, আমানুল্লাহপুর, বেগমগঞ্জ , ছয়ানি , দূর্গাপুর, একলাশপুর, গোপালপুর, নরোত্তমপুর , হাজীপুর , জিরাতলী, কাদিরপুর , কুতুবপুর, মীর ওয়ারিশপুর , রাজগঞ্জ , রসূলপুর , শরিফপুর ইউনিয়ন ও চৌমুহনী পৌরসভা নিয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা গঠিত। এই উপজেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ হচ্ছে ঃ হাফেজ মহিউদ্দিন সাহেবের মাজার , বেগমগঞ্জ গ্যাস ফিল্ড , ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম ডেল্টা জুট মিলস, কমলার দিঘি, হযরত ছায়েদুল আলম চিঃ (রঃ) মাজার শরীফ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ, টেক্্রটাইল কলেজ, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের আশ্রম, গ্লোব গ্রুপ অব ইন্ড্রাসট্রিজ উল্লেখযোগ্য।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাঃ শস্য শ্যামল, পাখি ডাকা তাল তমাল, নারিকেল ও সুপারি কুঞ্জ আর সোনালী ধানের মাঠ সমৃদ্ধ কোম্পানীগঞ্জ। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তরঙ্গমালা ক্রীড়া নৈপূণ্যে জেগে উঠেছে পলিমাটি বিধৌত এই সাগর তীর।এই সমতট অঞ্চলটি বৈদিক যুগেই ( ১৪০০ ও ১৫০০ খৃষ্টাব্দ পূর্বে ) জনবসতির উপযোগী হয়েছিল, তার প্রমাণ মেলে মহাভারতের ঘটনা পঞ্জিতে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আয়তন ৩২৪ বর্গ কিলোমিটার। উত্তরে সেনবাগ ও দাগনভূঁইয়া উপজেলা, পূর্বে সোনাগাজী ও মিরসরাই উপজেলা, দক্ষিণে সন্দ্বীপ ও সূবর্ণচর উপজেলা এবং পশ্চিমে কবিরহাট উপজেলা।
কোম্পানীগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস খুঁজলে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জ তথা যোগিদীয়া ছিল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর। ১৭৫৩ সালে এই স্থানে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কুঠি স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। ১৭৫৬ সালে কোম্পানী একটি বস্ত্রকল স্থাপন করে, পরে ফরাসীরাও এখানে বিশাল কাপড়ের কল স্থাপন করে এবং স্থানীয় যোগী (তাঁতী) দের উৎপাদিত দেশীয় বস্ত্রসহ এসব কাপড় এবং লবন যোগিদীয়া সমুদ্রবন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানী হত। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নামানুসারে পরবর্তীতে এই স্থানের নামকরণ করা হয় কোম্পানীগঞ্জ। এই কোম্পানীগঞ্জের যোগিদীয়ায় চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা, ভূষনা, বিক্রমপুর, মেহেরকূল অঞ্চলের পন্ডিতদের সম্মেলন বসতো এবং বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক মাষ্টারদা সূর্যসেন, অনন্তসিংহ, লোকনাথ বল, বিভুতি ভূষণ ভট্টাচার্য, হারানঘোষ প্রভুত এখানে বৈঠক করতেন। কোম্পানীগঞ্জ ৮টি ইউনিয়ন চর এলাহী, চর ফকিরা, চর হাজারী , চর কাঁকড়া , চর পার্বতী , মূসাপুর , রামপুর , সিরাজপুর ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ১৯৮৩ সনের ২ জুলাই উপজেলাটি উদ্বোধন করা হয়। উপজেলার দর্শনীয় স্থান ঃ মুসাপুর রেগুলেটর, শাহজাদপুর সুন্দলপুর গ্যাস ক্ষেত্র, ছোট ফেনী নদী ও গুচ্ছ গ্রাম উল্লেখযোগ্য

হাতিয়া উপজেলাঃ হাতিয়া উপজেলা নোয়াখালী জেলার বেশ কিছু উপকূলীয় দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর এলাকার পরিমাণ ২১০০ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে সুবর্ণচর উপজেলা ও উত্তর পশ্চিমে রামগতি উপজেলা, দক্ষিণে ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর, এবং পশ্চিমে মনপুরা উপজেলা অবস্থিত। হাতিয়া উপজেলা বুড়ির চর , চন্দনান্দি , চর ঈশ্বর , চর কিং , হরণি , জাহাজমারা , নলছিঙ , নিঝুম দ্বীপ , সোনাদিয়া , সুকচর , তমরুদ্দীন ইউনিয়ন ও ০১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। হাতিয়া শহর এলাকা ৩ টি মৌজা নিয়ে গঠিত। এর মোট এলাকা ২৫.৭২ বর্গ কিলোমিটার। প্রমত্তা মেঘনা আর বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির প্রচন্ড দাপটের মুখে হাতিয়ায় প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার কারণে এক থেকে দেড়শ’ বছরের পুরনো কোনো নিদর্শন অবশিষ্ট নেই। ১৮৯০ সাল থেকে হাতিয়ার আদি ভূখন্ডের উত্তর ভাগের ভাঙন শুরু হয়। বিরাট আয়তনের জমি নদী ও সাগরের ভাঙনে বিলুপ্ত হলেও একই সময় দ্বীপের উত্তর দিকে হাতিয়ার আয়তন ভাঙনের প্রায় ২ থেকে ৫ গুণ হারে বাড়তে শুরু করে। ১২০ বছরের ব্যবধানে হিসাব-নিকাশে ঢের পরিবর্তন এসেছে। অনেক চর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিছু কিছু আবার ভাঙনের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে। কিংবদন্তি রয়েছে যে, খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে এখানে একটি বৃহত্তম জামে মসজিদ গড়ে ওঠে। এটিই ছিল হাতিয়ার ঐতিহাসিক প্রথম জামে মসজিদ। নির্মাণের প্রায় ৮০০ বছর পর ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

সুবর্ণচর উপজেলাঃ সুবর্ণচর উপজেলা নোয়াখালী জেলার একটি নবসৃষ্টি উপজেলা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের ০২ এপ্রিল ২০০৫ তারিখের প্রজ্ঞাপন জারীর মাধ্যমে এ উপজেলার গোড়াপত্তন ঘটে। নোয়াখালী সদর উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ৭টি ইউনিয়ন চর আমানুল্লাহ , চর বাটা , চর ক্লার্ক , চর জব্বার , চর ওয়াপদা , মোহাম্মদপুর , পূর্ব চর বাটা ইউনিয়ন নিয়ে এ উপজেলার সৃষ্টি হয়। জেলা হতে উপজেলা সদরের দুরত্ব প্রায় ২৩ কিঃ মিঃ উপজেলার মোট আয়তন ৫৭৬.১৪ বর্গ কিঃ মিঃ। নবগঠিত ভূমিরূপের অপরূপ সৌন্দর্য রয়েছে এ উপজেলায়। যার বিস্তৃতি বনভূমিপূর্ণ দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল। এই উপজেলায় কিছু দর্শণীয় স্থান রয়েছে। যা সব সময় স্থানীয় দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখর থাকে। সুবর্ণচর অফিসার্স ক্লাব সহ উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স গ্লোব ফিশারিজ প্রজেক্ট, আল-আমিন ফিশারিজ প্রজেক্ট, চর মজিদ ফরেস্ট এরিয়া, সোলেমান বাজার সংলগ্ন বেড়ী বাঁধ এলাকা, ৪নং স্টীমার ঘাট লেক উল্লেখযোগ্য।

কবিরহাট উপজেলাঃ নোয়াখালী সদর উপজেলার নরোত্তমপুর, সোন্দলপুর, ধানসিঁড়ি, ঘোষবাগ, চাপরাশিরহাট, ধানশালিক, বাটইয়া ইউনিয়ন ও কবিরহাট পৌরসভা ( ১৬০.৪৩ বর্গ কিলো মিটার আয়তন ৭৪ টি মৌজা ৬৯টি গ্রাম) নিয়ে কবিরহাট উপজেলা গঠিত হয়। নবসৃষ্ট কবিরহাট উপজেলা উদ্বোধন হয় ৫ই সেপ্টেম্বর ২০০৬ ।

সেনবাগ উপজেলাঃ নোয়াখালী জেলাধীন বেগমগঞ্জ থানার একটি অংশ ছিল আজকের সেনবাগ উপজেলা। সেনবাগ ১৫৮ বর্গ কিলোমিটারের একটি জনপদ। এখনো সেনবাগ এবং বেগমগঞ্জ উপজেলার মৌজাগুলি একই ক্রমিকে রয়েছে। তৎকালীন বেগমগঞ্জ থানার উত্তর-পূর্ব কোণে প্রায়ই আইন শৃংখলার অবনতি ঘটতো। এ কারণে ১৯২২ সালে নিজ সেনবাগ গ্রামের “বাঘরা দিঘী”র পাড়ে একটি ফাঁড়ি থানা স্থাপন করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে এই ফাঁড়ি থানাকে পূর্নাঙ্গ থানায় রুপান্তরিত করে মিরগঞ্জ বাজারে (বর্তমান সেনবাগ বাজার) স্থাপন করা হয়। বেগমগঞ্জ থানা থেকে ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে (বর্তমানে ৯টি ইউনিয়ন) সেনবাগ থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। নিজ সেনবাগ গ্রামে ফাঁড়ি থানা থেকে বর্তমানে স্থানে স্থাপনের সময়ই নিজ শব্দ বাদ দিয়ে শুধু সেনবাগ নামকরণ করা হয়। সেনবাগ উপজেলার ইউনিয়নসমূহ হচ্ছে ঃ অর্জুনতলা , বিজয়বাগ , ছাতারপাইয়া , ডুমুরিয়া , কাবিলপুর , কাদরা , কেশরপুর , মোহাম্মদপুর , নবীপুর ইউনিয়ন । সেনবাগ উপজেলার দর্শনীয় স্থান গূলো নিন্মরূপ ঃ ডমুরুয়া ইউনিয়নের বাবুপুর শ্রীপুর গ্রামের গাজী এয়াকুব আলী সাহেবের মাজার শরিফ, কাবিলপুর ইউনিয়নের হাক্কানী মসজিদ, কেশারপাড় ইউনিয়নের কেশারপাড় দিঘি, ডমুরুয়া ইউনিয়নের মতইনের গৌতম বৌদ্ধ বিহার ।

সোনাইমুড়ি উপজেলাঃ সোনাইমুড়ি একটি সমৃদ্ধ জনপদ । ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সোনাইমুড়ি বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে । ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থার বিচারে এ অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ । ২৬ জানুয়ারী, ২০০১ সালে সোনাইমুড়ি থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২৯ জানুয়ারী, ২০০৫ সালে এটিকে নতুন প্রশাসনিক উপজেলা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । ০৪ এপ্রিল, ২০০৫ সালে সাবেক বেগমগঞ্জ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক উপজেলা হিসাবে সোনাইমুড়ি আত্মপ্রকাশ করে । অম্বরনগর , আমিষাপাড়া , বড়গাঁও , বজরা , চাষীরহাট , দেওটি, জয়াগ , নদানা , নাটেশ্বর , সোনাপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভা নিয়ে সোনাইমুড়ি উপজেলা গঠিত।

চাটখিল উপজেলাঃ চাটখিল উপজেলা প্রাচীন সমতট জনপদের একাংশ। নোয়াখালী জেলার ক্ষুদ্রতম উপজেলা হিসেবে ০১ আগষ্ট ১৯৮৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তরে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলা, দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলা, পূর্বে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলা, পশ্চিমে রামগঞ্জ উপজেলা। চাটখিল উপজেলা ০১ টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত। ইউনিয়ন গুলো হচ্ছে: বদলকোর্ট, খিলপাড়া, নোয়াখলা, পরকোট, সাহাপুর, হ্টাপুকুরিয়া-ঘাটলাবাগ, মোহাম্মদপুর, পাঁচগাঁও এবং রামনারায়ণপুর। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারী চাটখিল পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। জনশ্রুতি আছে যে, অতীতে এ এলাকায় একটি বিল ছিল। এ বিলে চাটপোকার অবস্থানের জন্য স্থানীয় অধিবাসীরা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। কালক্রমে এ বিল এলাকায় জনবসতি স্থাপন হয় এবং এলাকার নাম হয় চাটখিল ।

নোয়াখালী সংস্কৃতিঃ এই অঞ্চলে বিয়ে শাদী, জন্ম, খতনা নিয়ে অনেক উৎসব পালন করা হয়। বিয়ে বাড়ীতে বর আগমনের জন্য কলাগাছ দিয়ে তোরন নির্মাণ করে বরকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বর পক্ষ এবং কনে পক্ষের মধ্যে গজল আকারে প্রশ্ন উত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করতে হয়। তোরনের দুই পাশে দাড়িয়ে প্রশ্ন উত্তর শেষে জয় পরাজয় নির্ধারন করে তোরনের মধ্য দিয়ে শরবত খেয়ে প্রবেশ করতে হত।

কনে পক্ষ- আচ্ছালামু আলাইকুম এবা, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো, তোমরা আইছো কেবা?
বর পক্ষ- ওয়ালাইকুম ছালাম ওবা, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো আমরা আইছি শোবা,
কনে পক্ষ- লোহার সিন্দুক হিতলের তালা, দুলাভাই গরে আইতে বিষন জ্বালা
বর পক্ষ- করাচির চাবি লন্ডনের তালা, ঘরের ভিতরে যাইতে কত লাগে বালা
কনে পক্ষ- গরে গরম বাইরে ঠান্ডা, দুলাভাই খাড়াই থান দুই চার ঘন্টা।
বর পক্ষ- উলি গাছের তুলি, আসমান গেছে ঢুলি, কোন ভাবিসাব ঘরে আছেন, দুয়ার দেন গো খুলি।

এরপর মুরব্বিদেরদের একজন এসে এই বিতর্ক থামায়ে দিয়ে বরকে ভেতরে নিয়ে যান। এরপর শালা শালিরা সম্মানী দাবী করে গানের ভাষায়- আহারে নওশা সাজিলি ভরসা, সম্মানী কি ধন চিনলিনারে, সম্মানী যদি রাখতে চাওরে, ১০০ টাকা ফেলিয়া দাওরে। আকাশ সংস্কৃতির যুগে এই রকম অনেক সংস্কৃতি ও প্রথা এখন প্রায় বিলুপ্ত। তারপরও গ্রামাঞ্চলে এখনও নোয়াখালীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে।

জেলার ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানঃ
নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরীঃ
“নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরী ”প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৫ সালে (বাংলা ১৩০২) নোয়াখালী পুরান শহরে। ১৯৪৪ সালে যখন নোয়াখালী পুরান শহর মেঘনার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল তখন লাইব্রেরীটি স্থানান্তরিত হয়ে নোয়াখালীর প্রধান শহর মাইজদী কোর্টে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এ লাইব্রেরীতে বর্তমানে প্রায় ২০,০০০ বই আছে। সংগ্রহ ভান্ডারে রয়েছে ব্রিটিশ ভারতের অনেক দুর্লভ বইও । শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এ লাইব্রেরী এখনও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বসাধারণের মাঝে।

নোয়াখালী জামে মসজিদঃ নোয়াখালীর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে এক অপূর্ব স্বর্গীয় ভাবাবেগ নিয়ে অবস্থান করছে মাইজদী জামে মসজিদ। প্রতিদিন শতশত ধর্মপ্রাণ মুসল্লী নিয়মিত এই মসজিদে নামাজ আদায় করেন।১৮৪১ সালের পুরাতন নোয়াখালী শহরে মরহুম ইমাম উদ্দিন সওদাগর নিজের জমিতে জামে মসজিদটি স্থাপন করেছিলেন। মূল নোয়াখালী শহর মেঘনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবার সময় সেই মসজিদটিও নদীগর্ভে চিরতরে হারিয়ে যায়। পুরাতন নোয়াখালী শহর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবার পরে মাইজদীতে নতুন শহর গড়ার সময়েই ১৯৫০ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়।এই মসজিদটির মূল এলাকা প্রায় ৩ একর ৮০ ডিসিমেল। এই মসজিদটি তৈরির সময় ছোট এক তলা ভবনে অপরুপ মুসলিম ও দেশী লোকজ শিল্প সৌন্দর্যে লতাপাতা আর নানা কোরআনের আয়াত ও উপদেশ বাণী উৎকীর্ণ করে নির্মান করা হয়। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৩০ ফুট ও প্রস্থে ৮০ ফুট আয়তনে মূল ভবনে তিনটি সুর্দৃশ্য গম্বুজ ও নয়টি সুউচ্চ মিনার ইসলামী স্থাপত্যে নির্মিত হয়।


নিঝুম দ্বীপঃ নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী তথা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। নোয়াখালী জেলার দক্ষিণে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত হাতিয়া উপজেলার সর্বদক্ষিণে নিঝুমদ্বীপের অবস্থান। ১৯৪০ এর দশকে এই দ্বীপটি বঙ্গোপসাগর হতে জেগে উঠা শুরু করে। চর গঠনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ৪০ এর দশকের শেষদিকে নিঝুমদ্বীপ তৃণচর বা গোচারণের উপযুক্ত হয়ে উঠে। মাছ ধরতে গিয়ে হাতিয়ার জেলেরা নিঝুমদ্বীপ আবিস্কার করে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি নিঝুমদ্বীপে জনবসতি শুরু হয়। মূলত হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে কিছু জেলে পরিবার প্রথম নিঝুমদ্বীপে আসে। সমগ্র নিঝুম দ্বীপের প্রায় ৩০০০.০০ একরে মানুষের বসতি রয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশে ম্যানগ্রোভ বনায়ন রয়েছে। ইছামতির দ্বীপ, বাইল্যার চর বা চর ওসমান যে নামেই স্থানীয় ভাবে প্রচলিত হোক না কেন ৮০ এর দশকের শুরুহতে এই দ্বীপটি বাংলাদেশের জনগণের নিকট নিঝুম দ্বীপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।


উর্বর চরাঞ্চল: মেঘনা নদী বিধৌত নোয়াখালীতে জেগে উঠা চরে বিভিন্ন ধরণের ফসলের আবাদ বেশ প্রশংসনীয় ও কৃষকদের সাফল্যমন্ডিত করে তুলেছে। এই সকল উর্বর চরাঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের ফসলের মধ্যে মৌসুমী ফসল ও শাক-সবজি যেমনঃ তরমুজ, ধান, বাদাম,ডাল,আলু,ভূট্টা ইত্যাদি প্রচুর উৎপন্ন হয়।


কমলার দিঘীঃ কমলা দিঘী নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত। এ দিঘী নিয়ে অনেক পুরানা কাহিনী এ এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। দিঘীর আকার ও বিশালত্ব একে অন্যরকম মর্যাদা দিয়েছে।



বজরা শাহী মসজিদঃ ৩০০ বছরের মোগল স্থাপত্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন 'বজরা শাহি মসজিদ'। ১৭৪১ সালে মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহর রাজত্বকালে তাঁর নির্দেশে ও অর্থে মিয়া আম্বরের সহযোগিতায় জমিদার আমান উল্যাহ খান দিল্লির শাহি মসজিদের অনুকরণে এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। জমিদার আমান উল্যাহ্ তাঁর বাড়ীর সম্মুখে ৩০ একর জমির উপর উঁচু পাড় যুক্ত একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। এ দিঘীর পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে আকর্ষণীয় তোরণ বিশিষ্ট প্রায় ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ৭৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট এ ঐতিহাসিক মসজিদখানা নির্মাণ করেন। এ মসজিদকে মজবুত করার জন্য মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে ভীত তৈরী করা হয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দ্বারা গম্বুজগুলো সুশোভিত করা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে ৩টি ধনুকাকৃতি দরজা। মসজিদের প্রবেশ পথের উপর রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। কেবলা দেওয়ালে ৩টি কারুকার্য খচিত মিহরাব আছে।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর ঃ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যগণ কর্তৃক দানকৃত ০.২০ একর ভূমিতে সরকারের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুযোগ- সুবিধা সম্পলিত এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে একটি সুপরিসর এবং সুসজ্জিত পাঠকক্ষ ছাড়াও অভ্যর্থনা কক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক ও লাইব্রেরিয়ানের জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে।

মেঘনা মোহনাঃ মেঘনা মোহনা স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যানঘাট নামে বহুল পরিচিত। জেলার মোট ৯টি উপজেলার একটি হাতিয়া যেখানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই মোহনার অংশবিশেষ পাড়ি দিতে হয়।এ জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর অকৃত্রিম বিশুদ্ধ বাতাসে দেহ-প্রাণ যেন জুড়িয়ে যায়।


গান্ধী আশ্রমঃ ১৯৪৬- এর শেষ ভাগে সারা ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। তখন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এসে পড়ল নোয়াখালীতে। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় সাম্প্রদায়িকতার তান্ডবলীলা দেখা দেয়। আগুনে পুড়ে যায় বহু সাজানো সংসার। শান্তি মিশনের অগ্রদূত হয়ে নোয়াখালীতে ছুটে আসেন মহাত্মা গান্ধী। চৌমুহনীতে মহাত্মা গান্ধী জনসভায় প্রথম বক্তৃতা করেন। তারপর জনসভা করেন দত্তপাড়া গ্রামে। ধারাবাহিকভাবে চলে তাঁর পরিক্রমা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছেন। সেদিনই নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার জয়াগ গ্রামের কৃতী সন্তান হেমন্ত কুমার ঘোষ তাঁর জমিদারির স্থাবর- অস্থাবর সম্পত্তি জনকল্যাণ খাতে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করেন। আশ্রম পরিচালনার ভার দেয়া হয় গান্ধীজীর স্নেহভাজন শ্রীযুক্ত চারু চৌধুরীর ওপর।


নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ঃ নোয়াখালী জেলা শহর থেকে আট কিলোমিটার দক্ষিণে সোনাপুর-চরজব্বার সড়কের পশ্চিম পাশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। দেশের একটি অন্যতম আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ১০১ একর জায়গা ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশের ২৭ তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫ম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। শুরুতে এই বিশ্ববিদ্যালয় ৪টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এখানে দশটি বিভাগ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।


মহিষের দধি ঃ নোয়াখালীর অনেক গুলো ঐতিহ্যর মধ্যে একটি মহিষের দধি। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও সুবর্ণচর উপজেলা প্রত্যন্ত আঞ্চল থেকে মহিষের দধি সংগ্রহ করা হয় । উৎপাদিত মহিষের দধি খুবই সুস্বাদু এবং এই এলাকায় খুবই জনপ্রিয়।



সুপারী ও নারিকেলঃ নোয়াখালী জেলার মাটি সুপারী ও নারিকেল চাষের উপযোগী, তাই প্রচীন কাল থেকে এই এলাকায় সুপারী ও নারিকেল গাছের আধিক্য দেখা যায়। সমগ্র নোয়াখালী জেলা নারিকেল সুপারির জন্য দেশব্যাপী বিখ্যাত।


তথ্যসূত্রঃ ১) বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "এক নজরে নোয়াখালী"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ